New Muslims APP

হজের তাৎপর্য

imagesCA9X4LWO

ইসলাম ধর্মের মূল স্তম্ভ পাঁচটি। তার মধ্যে হজ অন্যতম। সঙ্গতিসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য পৃথিবীর প্রথম উপাসনালয় কাবাশরিফ তাওয়াফ ও হজের কার্যাবলি সম্পন্ন করা অবশ্যকর্তব্য। হজের তাত্পর্যপূর্ণ একটি দিক হচ্ছে—এটি সমগ্র বিশ্ব মুসলিমের এমনই এক মহাসম্মেলন যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের, বিভিন্ন বর্ণের, ভাষা এবং আকার-আকৃতির মানুষ একই ধরনের পোশাকে সজ্জিত হয়ে একই কেন্দ্রবিন্দুতে এসে সমবেত হন। সবারই লক্ষ্য বিশ্ব মানবের প্রথম উপাসনা কেন্দ্র কাবার জিয়ারত, সবার মুখে একই ভাষার একটিমাত্র কথা—লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক! যার বাংলা অর্থ হাজির হয়েছি ওগো আল্লাহ! হাজির হয়েছি! এসেছি, তোমার ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য এসেছি। আমার সবকিছু তোমার কাছে সমর্পণ করতে এসেছি।তাই বলতে হয়, হজের এ সফরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নয়, কোনো লক্ষ্য নয়, কোনো পার্থিব স্বার্থের আকর্ষণ নয়, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকুতিটুকুই একান্ত কাম্য হয়ে দাঁড়ায়। আর এভাবেই হৃদয়ের গভীরে অঙ্কুরিত হয় বিশ্বভ্রাতৃত্বের এক শুচিশুভ্র ফল্গুধারা।
দ্বিতীয়ত, হজের এ মহাসমাবেশে সমগ্র বিশ্বমানব এমনই একটি কেন্দ্রবিন্দুতে এসে সমবেত হন, যা মানবজাতির প্রথম আবাস্থল। উম্মুলকোরা মক্কানগরীতেই যে আদি মানব হজরত আদম (আ.) প্রথম বসতি স্থাপন করেছিলেন এ তথ্য সন্দেহাতীত। সে আদি বসতির মধ্যই এক আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগির লক্ষ্যে স্থাপিত প্রথম গৃহ পবিত্র বাইতুল্লাহ। বর্ণিত আছে, হজরত আদম উম্মুলকোরা পবিত্র মক্কায় স্থিত হওয়ার পর মোনাজাত বা প্রার্থনা করেছিলেন, ঊর্ধ্ব জগতে ফেরেশতাদের উপাসনাস্থল বাইতুল মামুরের অনুরূপ একখানা উপাসনালয় পাওয়ার জন্য। আল্লাহর সে প্রার্থনা মঞ্জুর করেই ফেরেশতা জিবরাইলের মারফতে বাইতুল মামুরের সঠিক বরাবরই মাটির ওপর পবিত্র কাবাঘর নির্মাণের স্থান নির্দেশ করেন।

এ ঘরের যে চৌহদ্দিটুকু হরম বা পবিত্রতার সীমারেখায় চিহ্নিত সেটুকুও ফেরেশতার মাধ্যমেই আল্লাহপাক দেখিয়ে দিয়েছিলেন। ইতিহাসের সে প্রথম গৃহে, মানব সন্তানের জন্য সৃষ্ট প্রথম ইবাদতগাহ বা উপাসনালয়ে আদি মানবের বার্ষিক এ মহাসমাবেশে যে আবেগময় অনুভূতি সৃষ্টি করে সে অনুভূতি সমগ্র বিশ্বমানব তথা আদি সন্তানের একই রক্তের উত্তরাধিকার এবং আত্মীয়তার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনকেই নবায়িত করার অনুভূতি। ইবাদতের লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয়েছিল সে ঘরটি। সুতরাং সে ঘরের প্রতি একটা আবেগপূর্ণ আকর্ষণ এক আল্লাহতে বিশ্বাসী প্রতিটি মানব সন্তানের মনমস্তিষ্ক সুপ্ত হয়ে থাকাটা নিতান্তই স্বাভাবিক। কয়েকদিনের হজের সফর প্রতিটি হজযাত্রীকে নিয়ে যায় মানুষের এ জন্মপ্রবাহ শুরুর সে প্রথম দিনগুলোতে। আজকের ভাষা, বর্ণ ও ভৌগোলিক সীমারেখা কণ্টকিত মানুষগুলো যখন কিছুদিনের জন্য সহজ-সরল পোশাক মাত্র দু টুকরো কাপড় পরিধান করে হজের অনুষ্ঠানগুলো পালন করেন, তখন তার মধ্যে যে উপলব্ধি জন্ম হয়, সেটা সব মানুষের প্রতি সহোদরপ্রতিম মমত্ব ছাড়া আর কি হতে পারে!
ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে হজ অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ইবাদত। অন্যান্য প্রার্থনা কোনোটা শারীরিক, কোনোটা মানসিক এবং কোনোটা আর্থিক। নামাজ, রোজা, প্রধানত শারীরিক শ্রম প্রধান। জাকাত, সদকা অনেকটা অর্থনির্ভর। কিন্তু হজের মধ্যে মানসিক, শারীরিক এবং আর্থিক—এ তিন প্রকার ইবাদতের এক অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছে। এ তিনটি ক্ষেত্রেই যার সমান সামর্থ্য রয়েছে, তার ওপরই হজ অবশ্যকর্তব্য করা হয়েছে। ফলে শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক দিক দিয়ে সামর্থ্যবান লোকগুলোই হজ করতে যাবেন এটাই প্রত্যাশিত। এদিক দিয়ে হজের সমাবেশকে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ তওহিদবাদী বিশ্বমানবের একটা সর্ববৃহত্ এবং সর্বাপেক্ষা তাত্পর্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্বশীল বিশ্ব সম্মেলন বলা যায়। এ মহাসম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে আমাদের এ বাংলাদেশেরও কয়েক হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান মক্কা শরিফে হজ করতে যান। এ সম্মেলনের প্রধান শিক্ষাই হচ্ছে আল্লাহর সামনে বান্দার সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। একই সঙ্গে সমগ্র বিশ্বমানবের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য এক ভ্রাতৃত্ববন্ধন গড়ে তোলার জন্য ব্রতী হওয়া। হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইয়ে ওয়া সাল্লামের সর্বশেষ হজের ভাষণের মধ্যে এ শিক্ষাই সর্বপেক্ষা গুরুত্বের সঙ্গে প্রদান করা হয়েছে। উদাত্তকণ্ঠে তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন—লোকসব, তোমাদের সবার প্রভু এক, তোমাদের সবার আদি পিতাও এক ব্যক্তি। সুতরাং কোনো আরব-অনারবের ওপর, কোনো কৃষ্ণাঙ্গের শ্বেতাঙ্গের ওপর কিংবা কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর কোনো শ্বেতাঙ্গের জন্মগত কোনো প্রাধান্য নেই। সম্মানযোগ্য হবে সে ব্যক্তি যে একনিষ্ঠ খোদাভীরু। মনে রেখ, প্রত্যেক মুসলমান একে অন্যের ভাই।
হরমের সীমারেখার মধ্যে বন্যপ্রাণী শিকার অবৈধ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য এ সফর হিংস্রতার নয়, এ সফর ভ্রাতৃত্বের-মমত্ববোধের।

মানুষের সৃষ্ট কৃত্রিম ভেদরেখার সব প্রাচীর ধসিয়ে দিল এক সৃষ্টিকর্তার জীব হয়ে জীবনযাপন করার। হাদিস শরিফের ভাষায়—তোমরা পরস্পর বিদ্বেষপোষণ কর না, একে অন্যের মর্যাদাহানির চেষ্টা কর না। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ো না। আল্লাহর সব অনুগত ব্যক্তি মিলে ভাই-ভাই হয়ে বাস কর। —বাইহাকি।  ইসলামের ইতিহাসে পাওয়া যায়—পবিত্র কাবার পুনর্নির্মাণ হজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুখ্য ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন বহুল আলোচিত আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম (আ.)। হজরত নূহের (আ.) সময়কার মহাপ্লাবনে বিধ্বস্ত কাবা শরিফ পুনর্নির্মাণ করার জন্য আল্লাহপাক তাঁর প্রিয়নবী ইবরাহিমের প্রিয়তম স্ত্রী হাজেরা এবং একমাত্র শিশুসন্তান হজরত ইসমাইলকে মক্কা প্রান্তরে এনে উপনীত করেছিলেন। হজের অন্তত উল্লেখযোগ্য দুটি অনুষ্ঠান কুরবানি ও সাফা-মারওয়ার সা’য়ী হজরত ইসমাইল ও তাঁর পুণ্যবতী মা হাজেরার দুটো পুণ্য স্মৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। মহান পিতা-পুত্র হজরত ইবরাহিম এবং হজরত ইসমাইলের অপূর্ব ত্যাগ-তিতীক্ষার পরীক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পরই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁদের বায়তুল্লাহ শরিফ পুনর্নির্মাণ করার নির্দেশ দেন। কাবা ঘরের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হওয়ার পর হজরত ইবরাহিমের প্রতি নির্দেশ হয়, সারাবিশ্বে হজের ঘোষণা প্রচার করার। তাঁকে আশ্বাস দেয়া হলো, ঘোষণা প্রচার করা তোমার কাজ আর কিয়ামত পর্যন্ত ভক্তজনের হৃদয়কন্দরে সে ঘোষণা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আমার। হজরত ইবরাহিমের সে ঘোষণার যেসব বাক্য হাদিস শরিফ থেকে জানা যায় তাতে দেখা যাচ্ছে কোনো বিশেষ দেশ, অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর সে আহ্বান ছিল না, এ আহ্বান ছিল সমগ্র মানবজাতির প্রতি।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

Leave a Reply


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.