New Muslims APP

ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। পৃথিবীর সব সৃষ্টি মানুষের সেবায় নিয়োজিত। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ঘোষণা হচ্ছে : তিনিই সেই মহান সত্ত্বা যিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের (ব্যবহারের) জন্য তৈরী করেছেন। (বাকারা ২৯)
আল্লাহ তা’আলা মানুষের জীবন বিধান হিসাবে একমাত্র ইসলামকে মনোনীত করেছেন। যুগে যুগে নবী রাসুলগণ মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে আহবান করেছেন। অশান্তি থেকে মুক্তির পয়গাম প্রদান করেছেন। আল্লাহ প্রদত্ত এবং রাসূল প্রদর্শিত এই জীবন বিধানের নামই ইসলাম।
ইসলাম একটি নির্ভূল ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। কেননা এর প্রবর্তক স্বয়ং আল্লাহ যিনি সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা, অতএব সৃষ্টিকর্তার রচিত জীবন বিধান নির্ভূল ও পূর্ণাঙ্গ হবে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এই জীবন বিধান নিয়ন্ত্রণের জন্য অর্থনীতি হচ্ছে মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আল্লাহ তা’আলা কুরআনের যতবার সালাত কায়েমের নির্দেশ প্রদান করেছেন সাথে সাথে অর্থনীতির কথা এমনভাবে উচ্চারণ করেছেন, যাতে প্রমাণিত হয় অর্থনীতি ও এর চালিকা শক্তি ব্যবসা বাণিজ্য মানুষের জীবনের অপরিহার্য শাখা। যেমন কুরআনুল করীমে ৮২ বার এরশাদ হয়েছে তোমার সালাত কায়েম কর ও যাকাত প্রদান করো।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাই মানুষের জন্য অর্থনৈতিক বিধান নির্দেশ করেছেন। ব্যক্তি জীবনে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বনবী মুহাম্মদ এমনবাবে উৎসাহিত করেছেন যে ভিক্ষাবৃত্তিকে তিনি নিন্দা করেছেন। উপার্জন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ হচ্ছে ঃ হালাল রুজি অন্বেষন করা প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ (বায়হাকী) মহানবী আরো বলেনে, যে ব্যক্তি হালাল রুজি দ্বারা তার পরিবার প্রতিপালনের চেষ্টায় থাকে, সে আল্লাহর পথে মুজাহিদের ন্যায়। জীবিকা অর্জনের জন্য পরিশ্রম একটি ইবাদত।
একদিন বিশ্বনবী (সাঃ) এর কাছে একজন আনছার এসে ভিক্ষা চাইল। তিনি বললেন, তোমার ঘরে কি কিছু নেই? লোকটি বলল, আমার একটি কম্বল আছে। তার এক অংশ পরিধান করি এবং এক অংশ শয়ন করি। নবী করীম (সাঃ) বললেন, দুটিই আমার নিকট নিয়ে আস। আনসারী লোকটি নির্দেশত তা নিয়ে এলো। রাসূল (সাঃ) তা হাতে নিয়ে বললেন, আমি এক দিরহামে তা কিনতে রাজি আছি। রাসূল (সাঃ) বললেন এক দিরহামের বেশি দিয়ে কেউ কিনবে কি? তিনি এভাবে তিনবার বলার পর এক সাহাবী বললেন আমি দুই দিরহামে কিনতে প্রস্তুত। রাসূল (সাঃ) দুই দিরহাম দিয়ে বললেন, এক দিরহামে কিছু খাবার ক্রয় করে তোমার স্ত্রীকে দিয়ে এসো। আর এক দিরহামে একটি কুঠার ক্রয় করে আমার নিকট নিয়ে এসো। লোকটি কুঠার ক্রয় করে তাঁর কাছে নিয়ে এলো। তিনি কুঠারে বাট লাগিয়ে বললেন, এবার কাঠ কেটে বিক্রি করো পনের দিনের মধ্যে আর এখানে আসবে না। পনের দিন পর লোকটি রাসূল (সাঃ) এর কাছে হাজির হলো তখন তার নিকট দশ দিরহাম ছিলো। তিনি বললেন নিজ হাতে উপার্জন কিয়ামতে তোমাদের মুখে চোয়ালে দাগ থাকার চেয়ে ভাল।
হযরত আয়েশা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত যে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তার সব পাপ সাফ হয়ে যায়। তিনি আরও বলেছেন নিজ হাতে অর্থ উপার্জত অর্থে আল্লাহর গ্রহণ অপেক্ষা উতম আর কিছু নেই। আল্লাহর নবী দাউদ (আঃ) নিজ হাতের কামাই খেতেন।
হালাল উপার্জনের নির্দেশ প্রদান করে আল্লাহ সুবাহানাহু তা’আলা এরশাদ করেন। অতপর যখন সালাত (নামায) সম্পন্ন হয়ে যাবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো। আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো। আশা করা যায় তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারবে। (সূরা: জুমা ১০) হালাল উপার্জন দোয়া কবলের শর্ত। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্র ব্যতীত কিছু গ্রহণ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের কে ঐ বিষয়ে আদেশ করেছেন যা তিনি রাসূলগণকে আদেশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র রিযিক থেকে ভোগ করো এবং ভাল কাজ করো এবং তিনি বলেছিলেন, হে মুমিন গণ তোমাদেরকে যে রিযিক দিয়েছেন তার মধ্যে পবিত্র বস্তু থেকে ভোগ করো। তারপর মহানবী উল্লেখ করলেন, লোকে দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করে এবং (দোয়া কবুল হওয়ার আশায়) আলু থালু কেশে ধুলায় দূসরিত অবস্থায় দু’ হাত আসমানের দিকে বাড়িয়ে ডাকে আয় প্রভু! আয় প্রভু!! অথচ তার খাবার হারাম তার পাণীয় হারাম, তার পোশাক হারাম এবং হারাম খাদ্য তাকে খাওয়ানো হয়ে থাকে, তা হলে কিভাবে তার মুনাজাতের জয়াব দেয়া হবে? (মুসলিম)
নামায কবুল হওয়ার ব্যাপারে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, কোন লোকের পেটে হারাম খাবার থাকলে আল্লাহ তার নামায কবুল করেন না। এসব হাদীস ও সাহাবীগণের বাণী থেকে প্রমাণিত হয়ে যে, হালাল রুজি না খেলে নামায কবুল হবে না। আর সওম, যাকাত ও হজ্জের ব্যাপারেও তাই। হালাল উপার্জনের ন্যায় হালাল খাতে ব্যয়ের গুরুত্ব ও কম নয়। এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করা যেতে পারে। রাসূল এরশাদ করেন (কিয়ামতের দিন) মানুষের পা একবিন্দু লড়তে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার নিকট এই পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা না হবে (১) নিজের জীবন কাল সে কোন কাজে অতিবাহিত করেছে (২) যৌবন শক্তি সামর্থ্য কোথায় ব্যয় করেছে (৩) ধন-সম্পদ কোথা হতে উপার্জন করেছ (৪) কোথায় তা ব্যয় করেছে এবং (৫) সে দ্বীনের যতোটুকু জ্ঞানার্জন করেছে সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে (তিরমিযী)
এ পর্যায়ে আমরা উত্তম উপার্জন প্রসঙ্গে আলোচনা করবো, হযরত মিক্কদাদ ইবনে মাআদী কারিব থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, যে রাসূল এরশাদ করেছেন: কেউ নিজ হাতের উপার্জন দ্বারা প্রাপ্ত খাদ্যের চেয়ে কোন উত্তম খাদ্য খেতে পারে না (বুখারী) হযরত রাফি বিন খাদিজ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল কে বলা হয় হে আল্লাহ রাসূল! কোন উপার্জন সর্বাপেক্ষা পবিত্র? তিনি বললেন কোন ব্যক্তির নিজ হাতের এবং হালাল ব্যবসার উপার্জন (আহমদ) নিজ হাতের উপার্জন যেমন পবিত্রতম, হালাল ব্যবসায় ও তেমনি পবিত্রতম। কুরআনুল কারীমে এরশাদ হচ্ছে আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম। (বাকারা ২৭৫) বস্তুত বিশ্বনবী (সাঃ) আয়ের উত্তম পথ হিসাবে শিল্প ও ব্যবসায়ের কথা বলেছেন, যা অন্যান্য হাদীস থেকেও জানা যায়। এরশাদ হয়েছে তোমরা ব্যবসা করো কেননা অর্থাগমনের ১০ ভাগের নয় ভাগ অংশই ব্যবসায় বাণিজ্যে। তিনি আরো বলেছেন, তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যবসা হচ্ছে বস্ত্র ব্যবসায়ী এবং শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম হচ্ছে দর্জি বিজ্ঞন।
বিশ্বনবী এবং অন্যান্য পয়গম্বরগণ শুধু বাণী প্রদান করে ক্ষন্ত হন নি। বরং শিল্প ও ব্যবসার ময়দানে তাঁদের বিশাল অবদান রয়েছে। আল্লাহ পাকের এরশাদ হচ্ছে “আমি তাঁকে (দাউদ)কে বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। (আম্বিয়া ৮০)
শিল্প শিক্ষাকে আল্লাহ তা’আলা নিয়ামত অভিহিত করেছেন। এবং এ জন্য শুকরিয়া আদায় করার ও নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর নবীগণ কোন না কোন শিল্প কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। দাউদ (আঃ) বর্ম শিল্পে নিয়োজিত ছিলেন বলে আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি শস্য বপন ও কর্তন করতেন। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের খিদমতের জন্য কোন কাজ করে তার দৃষ্টান্ত মুসা (আঃ) করিয়েছেন, আবার ফেরাউনের কাছ থেকে পরিশ্রমিক পেয়েছেন। নবী মুসা (আঃ)মাদইয়ানে ৮ বছর চাকরি করেছেন। যাকারিয়া জাহাজ নির্মাণ করেছেন। বিশ্বনবী (সাঃ) বাল্যকালে ছাগল চরায়েছেন, খন্দকের যুদ্ধে মাটি কেটেছেন। মাথায় বোঝা বহন করেছেন। কুফ থেকে পানি তুলেছেন। নিজ হাতে জামা ও জুতা সেলাই করেছেন। স্ত্রীকে ঘরে রান্নার কাজে সাহায্য করেছেন। এমন কী দুধ দোহন ও করেছেন এজন্য পেশা ক্ষুদ্র হোক, বড় হোক তাতে কিছু আসে যায় না। নিজের পরিশ্রম করে শ্রমলব্ধ আয় নিজের ও পরিবার বর্গের গ্রাসাস্বাদনের জন্য সংগ্রাম করা অতিশয় সম্মান ও পূণ্যের কাজ। মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে শিল্প ও বাণিজ্যের মহান পেশার মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হবার তাওফিক দিন। আমীন।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

One thought on “ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

Leave a Reply


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.