New Muslims APP

মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক

Untitled-1

তৃতীয় পর্ব

পরিবারের সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার প্রধান উপায় হলো স্ত্রীর সাথে সুসম্পর্ক বা দৃঢ় বন্ধন গড়ে তোলা। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই বন্ধন ঠিক গড়ে উঠছে না। এর কিছু কারণ আমরা গত কয়েকটি পর্বে তুলে ধরেছি। এবারের পর্বে আরো কিছু বিষয় নিয়ে আলোচন করব।
“ছেলেটা শেষ পর্যন্ত গোল্লায় গেল। পড়ালেখা কিছুই হচ্ছে না। খালি খেলাখুলা খা—-লি খেলাধুলা। হবে কোত্থেকে! যা একখানা স্কুল, তার আবার মাষ্টার। ছাগলকে ঘাষ খাওয়ায় আর ছেলেদের নামতা শেখায়। ছাগলগুলোও যা, যখনি দেখি খালি পেট, যেন এই দেশে ঘাস-টাস নেই। ঘাস থাকবেই বা কোত্থেকে। এখনকি আর অত খালি জায়গা আছে যে ঘাস জন্মাবে। যেখানে-সেখানে বাড়ি-ঘর উঠছে আর উঠছে। না উঠেই বা কি হবে! যেভাবে জন্ম নিচ্ছে পোলাপান! আজব এক দেশ! জায়গার চেয়ে মানুষ বেশী, এতবেশী সুনামী হইলো কিন্তু কোন কমতি নেই।”
এভাবে অভিযোগের নামতা পড়তে পড়তে লোকটি বাসায় এসে বৌকে বলতে শুরু করলো, “তোমার পোলাপানের কী খবর! খবর টবর কিছু রাখো! রাখবে কোত্থেকে, তোমার কি আর সংসারের চিন্তা আছে! যেন সংসারটাতো আমার একার! তোমারতো খালি বাপের বাড়ীর চিন্তা…..”
পৃথিবীতে এমন মানুষ সত্যিই বিরল যে তার নিজের অবস্থা নিয়ে পরিপূর্ণ সুখী। তারপরও কেউ কেউ নিজের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে সুখেই আছে, কারণ এর কষ্টের কথা মনের গভীরে গোপন করে রাখার চেষ্টা করে। পক্ষান্তরে কিছু কিছু লোক আছে, যারা এতো দুর্বলচিত্ত যে দুঃখ-কষ্ট বা সমস্যার কথা গোপন রাখতে পারে না। কাউকে পেলেই অভিযোগের সুরে বলতে শুরু করে দেয়। এ ধরণের লোকেরা পৃথিবীর সকল ব্যাপারেই অভিযোগ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এদের অভিযোগ থেকে কেউই আর বাদ পড়ে না। বন্ধু-বান্ধব কাউকে পেলেই শুরু হয়ে যায় অভিযোগ চর্চা। এ পর্বের শুরুতেই আপনারা যে ঘটনাটি জেনেছেন, তা-ই এর প্রমাণ। এরা ধীরে ধীরে বন্ধু-বান্ধবহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু পরিবার-পরিজন ও সন্তানরা এই অভিযোগকারীর কথা চোখ-কান বুঁজে শুনে যেতে বাধ্য হয়। তাদের আর কিছুই করার উপায় থাকে না। ভেতরে ভেতরে তাই অসহ্য ও বিরক্ত হয়ে পড়ে। বিপজ্জনক বিষয়টি হলো পরিবারের খুঁটিনাটি ব্যাপারেও এরা অভিযোগপ্রবণ হয়ে ওঠে। পরিবারের সবাই তাই অভিযোগ আতঙ্কে ভুগতে থাকে।
অভিযোগের ব্যাপারটি একচেটিয়া যদি হয়, তাহলে হয়তো সমস্যা হয় না। কিন্তু যখনি অপর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ আসে তখনি দেখা দেয় বিপর্যয়। এই বিপর্যয় পরিবারেরও বিপর্যয় ডেকে আনে। অথচ ইসলাম অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকাকে উত্তম আচরণ বলে মনে করে। কেউ কোন বিপদে পড়লে অন্যের কাছে অভিযোগ না করে আল্লাহর দরবারেই সকল সমস্যা সমাধানের জন্যে প্রার্থনা করা উচিত। কারণ আল্লাহই সকল কিছু সমাধানের মালিক।
মনে রাখবেন, আপনার স্ত্রী বাইরের বিভিন্ন ঝামেলা বা অভিযোগের কথা শুনতে চায় না আপনার কাছ থেকে, সে অন্য কিছু আশা করে। আপনি তার ইচ্ছা-আকাঙ্খাগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে এইসব বাজে প্রবণতা ত্যাগ করার চেষ্টা করুন । বাড়ি ফিরে বাইরের দুনিয়ার সব সমস্যার কথা ভুলে যান। পরিবারের সাথে সুখে-শান্তিতে সময়টা পার করার চেষ্টা করুন । হাসি-আনন্দে ভরে তুলুন সময়টাকে। পরস্পরের সান্নিধ্য উপভোগ করার চেষ্টা করুন। একসাথে খেতে বসুন, হাস্যালাপ করুন। আপনার স্ত্রীর রান্নাবান্নার প্রশংসা করুন। ছেলেমেয়েদের সময় দিন। তবেই গড়ে উঠবে সোনালী নীড়।
কিছু কিছু মানুষ আছে খিটখিটে মেজাজের। তারা খালি দোষ খুঁজে বেড়ায়। আর কিছু একটা পেলেই ঝগড়া বাঁধিয়ে দেয়। কথায় কথায় ঝগড়া করাটাই তাদের কু-অভ্যাস। তারা তুচ্ছ কোন ব্যাপার নিয়েও এতো বাড়াবাড়ি করে যে, সংসারে সবসময় ঝগড়া বেঁধেই থাকেই। কোন স্ত্রীই এ ধরনের খুঁতখুঁতে স্বভাবের স্বামীকে পছন্দ করে না। তাই বহু পরিবার ভেঙ্গে যায়। যেমন ধরুন বাসাবাড়ি সাধারণত স্ত্রীরাই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখে। কিন্তু অনেক সময় কাজের চাপে একটু আধটু দেরী হতেই পারে। অথচ দায়িত্বটা স্ত্রীর একার নয়। স্বামীরও বটে। কিন্তু স্বামী যদি সেই চিন্তা না করে গজ্ গজ্ করে বলতে থাকেন-টেবিলটা দেখি নোংরা হয়ে আছে, কেন? এ ঘরে কি কেউ নাই? আহ্ ! কতবার বলেছি এ্যাশট্রেটা কখনো ফ্লোরে রাখবে না, কে শোনে কার কথা?-(সজোরে )কী হলো, রান্নাবান্না হয়নি নাকি; ইত্যাদি।
একথা সত্য যে, সংসারে কাজকর্ম করতে গিয়ে ছোট-খাটো ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতেই পারে। সেই ভুল যে কেবল স্ত্রীরই হয়, তা নয় বরং স্বামীও ভুল করতে পারেন। এখন ভুল হলে সেজন্যে পরস্পরকে তিরস্কৃত না করে বরং আলাপ-আলোচনা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে ভুল সংশোধন করতে হবে। আলোচনার সৌহার্দ্যপূর্ণ পথ পরিহার করে স্ত্রীকে একচেটিয়া দোষারোপ করতে থাকলে স্ত্রী অবশ্যই স্বামীর ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়বে। যার পরিণাম না তাদের কারো জন্যে পুরো মঙ্গলজনক হবে, না তাদের সন্তান-সন্ততির জন্যে। পুরো পরিবার সংগঠনটিই বরং ভেঙ্গে যাবে। এ ধরণের পরিস্থিতি এড়াতে রাসূলের দিক নির্দেশনার প্রতি মনোযোগী হওয়াটাই একমাত্র উপায়। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা যারা শুনে শুনেই ঈমান এনেছো, কিন্তু আন্তরিক বিশ্বাসে যাদের হৃদয় এখনো পূর্ণ হয়নি, তাদেরকে বলি কোন মুসলমান সম্পর্কে নিন্দা করো না। কারণ যে বা যারা অপরের দোষত্রুটি বা খুঁত ধরে বেড়ায়, আল্লাহ তাদেরকে সমালোচনা করেন। আর এই রকম কোন ব্যক্তি সে যদি নিজের বাড়ীতেও থেকে থাকে, তবুও অসম্মানীত হবে।”
একটা ব্যাপার স্বামীদের অন্তরে সাধারণত কমই জাগে, আর তা হলো পুরুষের মতো নারীর মনও পরিবর্তিত আবেগের শিকার। যেমন সুখানুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়, তেমনি ক্রোধ এবং দুঃখেও ভারাক্রান্ত হয়। একঘেঁয়ে ঘরকন্যার কাজ, সন্তানদের কোন আচরণ কিংবা অন্যের কোন কথায়ও আপনার স্ত্রী রেগে থাকতে পারেন। এরকম বিপর্যস্ত মন নিয়ে তুচ্ছ কোন বিষয়েও অন্যদের সাথে তিনি রূঢ় আচরণ করে ফেলতে পারেন। এমন অবস্থায় তার রাগ ভাঙ্গানো স্বামীরই দায়িত্ব। কিন্তু কীভাবে! না, আপনি মোটেই স্ত্রীর রাগ ভাঙ্গাতে গিয়ে প্রভাব খাটিয়ে তার রাগের আগুনকে দ্বিগুন করে তুলবেন না। বাসায় ফিরে স্ত্রীকে রাগান্বিত দেখলে আপনি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুন, হাসি-খুশি থাকুন, কঠোরতা পরিহার করে হাসিমুখে কথা বলুন। টুকিটাকি কাজে তাকে সহযোগিতা করুন। কোনভাবেই আপনি জানতে চাইবেন না যে, ‘কী ব্যাপার বলো তো!’ বরং আপনার স্ত্রী যদি নিজ থেকে কথা বলতে চায়, গভীর মনোযোগের সাথে তার কথা শোনার চেষ্টা করুন এবং তার সমস্যা সমাধানে আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল হবার চেষ্টা করুন। ক্ষোভের কারণ দূর করার কাজে সহযোগিতা করুন, তাকে সান্ত্বনা দিন। আপনার সাহায্যই তার কাছে সবচেয়ে বেশী মূল্যবান বলে প্রতীয়মান হবে। এর ব্যতিক্রম কোন আচরণ করলে আপনাদের মধ্যকার মানসিক সংঘাত তীব্রতর হবে। নবী-রাসূলদের কথা বাদ দিয়ে বলা যায়, দুনিয়ার কোন মানুষই ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। কিংবা কেউই সম্পূর্ণ নিখুঁত বা সর্বগুণ সম্পন্ন নয়। তারপরও বিয়ের আগে প্রতিটি স্বামী মনে মনে কল্পনা করে যে, তার স্ত্রীটি হবে সর্বগুণে গুণান্বিতা একটি আদর্শ নারী। কিন্তু বাস্তবেতো তা সম্ভব নয়। সেজন্যে বিয়ের পর কল্পনার স্ত্রীর সাথে বাস্তবের স্ত্রীকে মিলিয়ে দেখলে বহু অপূর্ণতা চোখে পড়ে। স্বামীটি তখন ভাবতে থাকে, কী চেয়েছিলাম, আর কী পেলাম! এধরণের হতাশা ব্যক্ত করে পরিপূর্ণতার খোঁজে বাইরের দিকে দৃষ্টি দেয় । স্ত্রী তাকে ফেরাতে চাইলে স্ত্রীকে মারধর করে, অপমান করে, গালাগালি করে। গত ১৮ই জানুয়ারী তারিখের বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোর প্রতি যাদের দৃষ্টি পড়েছে, তারা নিশ্চয়ই আজম রেজা’র ফাঁসীর খবরটি পড়তে ভোলেন নি। আজম রেজা ছিলেন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। বিয়ে করেছেন, জয়ন্তী নামের এক সুন্দরী শিক্ষিকাকে। কিছুদিন চমৎকার দাম্পত্য জীবন কাটানোর পর আজম রেজা আরেক সুন্দরী অভিনেত্রীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। কোন স্ত্রীরপক্ষেই এ ধরনের সম্পর্ক মেনে নেয়া সম্ভব নয়। জয়ন্তীও মেনে নেয়নি। ফলে আজম রেজা নির্মমভাবে স্ত্রীকে হত্যা করে। আদালত খুনের দায়ে আজম রেজাকেও ফাঁসীর আদেশ দেয়। এই যে দীর্ঘদিন পর স্বামীর পরকীয়া প্রেমে পড়া, তা নিশ্চয়ই হঠাৎ করে হয়ে ওঠেনি। একটু একটু করে দিনের পর দিন এরকম সম্পর্ক গড়ে ওঠে সাধারণত। কিন্তু কেন? নিশ্চয়ই স্ত্রীর ব্যাপারে স্বামীর প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তিযোগ ঘটেনি, কিংবা এমন কোন ব্যাপার, যা স্বামী তার স্ত্রীকে ভালোবেসে বুঝিয়ে নিতে পারতো। আর যদি স্বামীই অবৈধ কামনা চরিতার্থতার জন্যেই অসৎ সঙ্গে পড়ে গিয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রী নিশ্চয়ই তা আগেই টের পেয়েছে। সেক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বামীকে বহির্মুখিতা থেকে ফেরানো স্ত্রীর পক্ষে অসম্ভব ছিল না। তারপরও একান্তই যদি তা সম্ভব না-ই হতো, তাহলে সর্বশেষ পথ পারিবারিক আদালতে যাওয়া যেত। এসব ক্ষেত্রে নবীজীর শিক্ষা ছিল পরস্পরকে ক্ষমা করার ব্যাপারে উদার হওয়া। আজম রেজা আর জয়ন্তীর ক্ষেত্রে যেহেতু তা হয়নি, সেহেতু দুঃখজনক পরিণতি দুজনকে ভোগ করতে হলো। আর পরিবারটি ভেঙ্গে হয়ে গেল খান খান।

প্রথম পর্ব এখানে

দ্বিতীয় পর্ব এখানে

 

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

2 thoughts on “মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক

Leave a Reply


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.