New Muslims APP

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইসলাম

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইসলাম

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইসলাম

মাতৃভাষা, দেশপ্রেম- মায়ের টান এ তো ইসলামের সুর। স্বদেশের জন্য যে ভালোবাসাকেই ইসলামে দেশপ্রেম হিসেবে বিবেচনা করে বলা হয়েছে- স্বদেশপ্রেম ইমানের পার্ট। আল্লাহর রাসূল নিজে স্বদেশকে ভালোবেসে আমাদের জন্য নমুনা উপস্থাপন করে গেছেন। রাসূল (সা.) তার দেশ মক্কাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসতেন, মক্কার জনগণকে ভালোবাসতেন। তাদের হিদায়াতের জন্য তিনি কঠোর অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। কোনোদিন মক্কাবাসীর অকল্যাণ পর্যন্ত কামনা করেননি। তায়েফে এত নির্যাতন করল তার পরও কোনো বদদোয়া করেননি। মহানবী (সা.) সাহাবিদেরকে কাফিরদের অত্যাচারে আবিসিনিয়ায় হিজরতের অনুমতি দিলেও তিনি মক্কায় নির্যাতন সহ্য করে অবস্থান করলেন। পরিশেষে কাফিরদের কঠিন ষড়যন্ত্রের কারণে এবং আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে তিনি যখন মদীনায় হিজরত করেন, তখন মক্কার দিকে বারবার ফিরে তাকান। আর কাতর কণ্ঠে বলেন, ‘হে আমার স্বদেশ, তুমি কত সুন্দর! আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার আপন জাতি যদি ষড়যন্ত্র না করত, আমি কক্ষনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’ (আহমদ ও তিরমিযী)
স্বাধীনতা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সকল জনগোষ্ঠীর জন্য এক বিশেষ নিয়ামত। প্রকৃতিগতভাবে মানুষ স্বাধীন। প্রত্যেক মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে। এটাই মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আল্লাহ তায়ালা মানব জাতিকে সহজাত এমন প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যে, সে নিরঙ্কুশ কোনো সত্তার কাছে ছাড়া অন্য কারো কাছে নতি স্বীকার করতে চায় না। ধর্মপ্রাণ মানুষ এমন এক মহান সত্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে চায়- যিনি সর্বশক্তিমান ও সকল ক্ষমতার উৎস। সেই পরম সত্তা হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনি মানবজাতিকে প্রকৃতির অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ কর, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই।’ (সূরা আর-রুম :৩০)
ইসলাম মানব জীবনে স্বাধীনতাকে ইতিবাচক ও সুস্পষ্টভাবে উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টির সেরা জীবরূপে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়ে মানবজাতিকে অত্যন্ত সম্মানিত করেছেন। তাই মানুষ স্বাভাবিকভাবে এবং সঙ্গত কারণে বহুলাংশে স্বাধীনচেতা। সহজে কোনো প্রকার দাসত্ব মেনে নিতে চায় না। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভৃতি সব ধরনের পরাধীনতা ইসলামে সমর্থনীয় নয়। মানুষকে কোনো প্রকার দাসত্ব বা পরাক্রমশালী শত্রুর অত্যাচার ও পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা যাবে না-পবিত্র কুরআনের আয়াত থেকে এ চেতনা লাভ করা যায়। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে মুক্ত করে তাদেরকে তাদের গুরুভার হতে ও শৃঙ্খল হতে যা তাদের উপর ছিল, সুতরাং যারা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং যে নূর তাঁর সাথে অবতীর্ণ হয়েছে এর অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।’ (সূরা আল-আরাফ: ১৫৭)
ইসলামে স্বাধীনতার লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহর দেওয়া জীবন বিধানের অনুগমন ও সর্বত্র এর প্রতিফলন। ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) একটি স্বাধীন ভূখণ্ড লাভের কঠোর সাধনা করেছিলেন। পৃথিবীতে চিরসত্য, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যে সামষ্টিকভাবে সমর্পিত হওয়ার জন্য অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর তিনি ও তাঁর সাহাবিগণ মদীনায় হিজরতের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করেছিলেন এবং মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে সে স্বাধীনতার বিস্তৃতি ও পূর্ণতা অর্জিত হয়েছিল। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে চিন্তা ও মত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ প্রদান করে নবী করিম (সা.) ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। সে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সবাই শান্তি-শৃঙ্খলার এক অপূর্ব মেলবন্ধন লাভ করেছিল। মহানবী (সা.)-এর কল্যাণমূলক আরব রাষ্ট্র সারা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি চিরন্তন আদর্শের নমুনা হয়ে আছে।

ইসলাম মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার জোরালো তাগিদ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) হিজরত করার পর মদীনাকে নিজের মাতৃভূমি হিসেবে গণ্য করেন এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাঁর জীবনের অনেক প্রতিরোধ যুদ্ধ ছিল মদীনা রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য। মদীনায় হিজরতের পরেও কিছুসংখ্যক মুসলিম নারী ও শিশু মক্কায় অবস্থান করতে বাধ্য হন, যাদের হিজরত বা দেশত্যাগ করার কোনো সুযোগ-সুবিধা ছিল না। তারা মূলত মক্কায় পরাধীন অবস্থায় নির্যাতিত জীবন যাপন করছিলেন। তখন তারা এ মর্মে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছিলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! এই জনপদ- যার অধিবাসী জালিম, তা হতে আমাদেরকে অন্যত্র নিয়ে যাও; তোমার পক্ষ থেকে কাউকে আমাদের অভিভাবক কর এবং তোমার পক্ষ থেকে কাউকে আমাদের সহায় কর।’ (সূরা আন-নিসা :৭৫) অতঃপর ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে মক্কা বিজয় হয়। স্বাধীনতাকামী মজলুমদের আকুল প্রার্থনা মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ণ করা হয়েছিল।
প্রকৃতপক্ষে মানব জীবনে স্বাধীনতা মহান আল্লাহর অপূর্ব দান। স্বাধীনতার জন্য শোকর আদায় করে শেষ করা যায় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে সুসংহত করা ও সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। ১৯৭১ সালে যারা আমাদের এ অমূল্য স্বাধীনতা অর্জনে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ অবদান রেখেছেন- সেসব শহীদ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। সমগ্র জাতি তাদের কাছে চিরঋণী। সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে আমাদের সবারই স্বাধীনতা রক্ষায় ও ফলপ্রসূকরণে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। যে কোনো দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ যত না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব রাখে দেশগঠনে অংশীদারিত্ম। এক্ষেত্রে জনগণের ভূমিকাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। তারা নিজেদের অবস্থান থেকে দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য সাধ্যানুযায়ী ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। জাতির প্রয়োজনে তাদের আরো সক্রিয় ভূমিকা সময়ের অনিবার্য দাবি। স্বাধীন দেশের ক্রান্তিলগ্নে সব ভেদাভেদ ভুলে দলমত নির্বিশেষে সবার ঐক্য প্রয়োজন। আমাদের স্ব^াধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষা করতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নিবিশেষে সবার এগিয়ে আসা উচিত। তাই আসুন, সবাই মিলে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি একে অর্থবহ করতে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত দেশগড়ার স্বপ্ন নিয়ে নতুন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

স্বাধীনতা মানুষের মধ্যে সত্য-সুন্দরের বোধ তৈরি করে এবং তাদেরকে মহান সৃষ্টিকর্তার আনুগত্যে সমর্পিত হওয়ার প্রেরণা দেয়। ইসলাম স্বাধীনতার প্রতি শুধু উদ্বুদ্ধই করে না, বরং স্বাধীনতা অর্জন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবনদানকে শাহাদাতের মর্যাদা প্রদান করে। ইসলামে এমন স্বাধীনতার মর্যাদা সম্পর্কে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘একদিন ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেওয়া পৃথিবী ও তার অন্তর্গত সবকিছুর চেয়ে উত্তম।’ (মুসলিম শরীফ) অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ‘মৃত ব্যক্তির সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, ফলে তার আমল আর বৃদ্ধি পেতে পারে না। তবে ঐ ব্যক্তির কথা ভিন্ন যে ব্যক্তি কোনো ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। তার আমল কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং কবরের প্রশ্নোত্তর থেকেও সে মুক্ত থাকবে।’ (তিরমিযি, আবূ দাউদ)
স্বাধীন দেশের সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত নৌবাহিনীর মর্যাদা প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরায় এক রাত সমুদ্র তীরে যাপন করা ঘরে অবস্থান করে এক হাজার রাকাত নফল নামাজ আদায়ের চেয়ে উত্তম।’ (তাবরানী, সনদ সহীহ)
প্রকৃতপক্ষে মানব সমাজ থেকে অন্যায়ের মূল্যেৎপাটন করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান। সকল প্রকার শোষণ, নির্যাতন, অন্যায় ও অবিচারের মূলে রয়েছে জুলুম। পরাক্রমশালী শত্রুর অত্যাচার ও পরাধীনতার শৃঙ্খল অন্যায়ের দ্বারা ব্যক্তির স্বাধিকার হরণ করা হয়। পরাধীনতা জুলুমের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে সাহায্য করে। অথচ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জুলুমের অবসান ঘটানো ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তাই মানব জীবনে সার্বভৌম রাষ্ট্র অতীব প্রয়োজনীয়। স্বাধীন রাষ্ট্র ছাড়া সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত সমাজ বা জনগোষ্ঠী তৈরী করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ইতিহাসে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ মুক্তিসংগ্রাম, গণআন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ বা কঠিনতম কর্মের মধ্যে আত্মদানকারী অসংখ্য দেশপ্রেমিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মহান নেতাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। আমাদের দেশ ও মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাঁদের মর্যাদা অতি মহান, অতি উচ্চে। তাঁরা দেশ ও জাতির গৌরব।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, জাতি ২৬ শে মার্চ পালন করবে ৪৪তম স্বাধীনতা। কিন্তু দীর্ঘ এই চার যুগেও কি বাংলাদেশের সকল মানুষ স্বাধীনাতর প্রকৃত স্বাদ ভোগ করতে পারছে? গুম, খুন, মারামারি, কাটাকাটি, দখলদারী বিভিন্ন প্রকারের অবৈধ বাণিজ্য চলছে অহরহ। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, যেন “জোর যার মুল্লুক তার”। আমার অনেক নিরীহ মানুষের প্রশ্ন আমরা কি স্বাধীন?

 

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

Leave a Reply


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.