New Muslims APP

মাসায়েল মিক্ষা

এসো মাসায়েল শিখি

এসো মাসায়েল শিখি

প্রশ্ন: নামাজ পড়ার সময় উলা (আমাদের আঞ্চলিক ভাষা) (রফউল ইয়াদাইন) দেওয়া হয় এটা কুরআন ও হাদীস সম্মত কিনা। উলা দিলে সওয়াব আছেকি? মুহাম্মাদ আব্দুস সামাদ
উত্তর: রফউল ইয়াদাইন (রুকুতে যাওয়ার সময় ও রুকু হতে ওটার সময় হাত উঁচু করা) করা এবং না করা নিয়ে বিভিন্ন মাযহাব পন্থিদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। যারা রফউল ইয়াদাইনের বিপক্ষে, তারা বলেন: যেন একসময় রফউল ইয়াদাইন রাসূল (সা.) করেছেন, পরে এটি মনসূখ বা রহিত হয়েছে। আর যারা পক্ষে, তাদের দলীল রয়েছে অসংখ্য সহীহ হাদীস।
যারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী তারা নামাজে রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে ওঠার সময় রফ’উল ইয়াদাইন করে না। আলিম সমাজ আমাদের মত সাধারণ মুসল্লীদের বলে থাকেন, এটি নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) প্রথম দিকে করেছেন এবং শেষের দিকে বাদ দিয়েছেন অর্থাৎ মানসুখ হয়ে গেছে। সেই বিশ্বাসেই আজ সাধারণ মুসল্লীগণ রফ’উল ইয়াদাইন করেন না। যাহা অন্যান্য মাযহাব এবং আমাদের দেশে আহলে হাদীস বা সালাফীগণ করে থাকেন। মসজিদের হুজুরকে জিজ্ঞেসা করলে বলে, দু’ইটাই সুন্নাত। আসুন একটু বিস্তারিত আলোচনা করে দেখা যাকঃ
প্রথমেই আমাদের হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠ আলিমগণের মতামত দিয়ে শুরু করা যাকঃ
১।  ‘মোল্লা ‘আলী ক্বারী হানাফী (রহঃ) বলেনঃ সালাতে রুকুতে যাওয়ার সময় ও রুকু থেকে উঠার সময় দু’ হাত না তোলা সম্পর্কে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো সবই বাতিল হাদীস। তন্মধ্যে একটিও সহীহ নয়। (মাওযু’আতে কাবীর, পৃ-১১০)
২। হানাফী মুহাদ্দিস আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী হানাফী (রহঃ) রুকুতে যাওয়ার পূর্বে রফ’উল ইয়াদাইন করার ব্যাপারে ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ) সম্পর্কে লিখেছেনঃ ইমাম আবূ হানিফা সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তা ত্যাগ করলে গুনাহ হবে। (উমদাতুল ক্বারী, ৫/২৭২)
৩। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী হানাফী (রহঃ) বলেনঃ যে মুসল্লী রফ’উল ইয়াদাইন করে ঐ মুসল্লী আমার কাছে অধিক প্রিয় সেই মুসল্লীর চাইতে যে রফ’উল ইয়াদাইন করে না। কারণ রফ’উল ইয়াদাইন করার হাদীসগুলো সংখ্যায় বেশি এবং অধিকতর মজবুত। (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ২/১০)
তিনি আরো বলেন, রফ’উল ইয়াদাইন হচ্ছে সম্মান সূচক কর্ম। যা মুসল্লীকে আল্লাহর দিকে রুজু হওয়ার ব্যাপারে এবং সালাতে তন্ময় হওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দেয়। (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ২/১০)
৪। আল্লামা আবুল হাসান সিন্ধী হানাফী (রহঃ) বলেনঃ যারা এ কথা বলে যে, তাকবীরে তাহরীমাহ ছাড়া রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে উঠার সময় দু’ হাত তোলার হাদীস মানসূখ ও রহিত, তাদের ঐ দাবী দলীলবিহীন এবং ভিত্তিহীন। (শারহু সুনানে ইবনে মাজাহ, মিসরের ছাপা ১ম খণ্ড ১৪৬ পৃষ্ঠার টিকা)
৫। আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশমিরী হানাফী (রহঃ) বলেনঃ এ কথা জানা উচিত যে, সালাতে রফ’উল ইয়াদাইন করার হাদীস সূত্র ও ‘আমালের দিক দিয়ে মুতাওয়াতির, এতে কোনই সন্দেহ নেই। আর এটা মানসূখও নয় এবং এর একটি হরফও নাকচ নয়। (নাইলুল ফারকাদাইন, পৃ- ২২, রসূলে আকরাম কী নামায, পৃ-৬৯)
৬। হানাফী মাযহাবের ফিক্বাহ গ্রন্থাবলীতেও রাফ’উল ইয়াদাইনের পক্ষে বক্তব্য রয়েছে। তন্মধ্যকার কয়েকটি উল্লেখ করা হলঃ
(ক) রুকু’র পূর্বে ও পরে রফ’উল ইয়াদাইন করার হাদীস প্রমাণিত আছে। (আয়নুল হিদায়া ১/৩৮৪, নুরুল হিদায়া)
(খ) রফ’উল ইয়াদাইন করার হাদীস, রফ’উল ইয়াদাইন না করার হাদীসের চাইতে শক্তিশালী ও মজবুত। (আয়নুল হিদায়া ১/৩৮৯)
(গ) বায়হাক্বীর হাদীসে আছে, ইবনু উমার বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মৃত্যু পর্যন্ত সালাতের মধ্যে রফ’উল ইয়াদাইন করেছেন। (আয়নুল হিদায়া ১/১৮৬)
(ঘ) রফ’উল ইয়াদাইন না করার হাদীস দুর্বল। (নুরুল হিদায়া, ১০২)
(ঙ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে রফ’উল ইয়াদাইন প্রমাণিত আছে এবং এটাই হাক্ব। (আয়নুল হিদায়অ ১/৩৮৬)
এবার সহীহ হাদীসের আলোকে রফ’উল ইয়াদাইনের কয়েকটি প্রসিদ্ধ হাদীস বর্ণনা করা হলোঃ
(১) ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে দেখেছি, তিনি যখন সালাতেস জন্য দাঁড়াতেন তখন কাঁধ পর্যন্ত দু’ হাত উঠাতেন, এবং তিনি যখন রুকুর জন্য তাকবীর বলতেন তখনও এরূপ করতেন, আবার যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখনও এ রকম করতেন এবং সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ বলতেন। তবে তিনি সাজদাহর সময় এমন করতেন না। (সহীহুল বুখারী, ৭৩৪, ৭৩৫, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, আহমাদ, মুয়াত্তা মালিক, মায়াত্তা মুহাম্মাদ, ত্বাহাভী, বায়হাক্বী, তিরিমিযী)
(২) মালিক ইবনুল হুওয়াইরিস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সালাতের জন্য তাকবীর দিতেন তখন কান পর্যন্ত দু’ হাত উঠাতেন। একইভাবে তিনি রুকু’তে যাওয়ার সময় কান পর্যন্ত দু’ হাত উঠাতেন এবং রুকু’ থেকে উঠার সময়ও কান পর্যন্ত হাত উঠাতেন ও সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ বলতেন। (সহীহ মুসলিম হা/৩৯১, সহীহ সুনানে ইবনে মাজাহ, সহীহ আবূ দাউদ, ইরওয়অ ২/৬৭, হাদীসটি সহীহ)
(৩) আলী (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে তাকবীরে তাহরীমাহর সময়, রুকু’র সময়, রুকু’ হতে মাথা উঠানোর সময় এবং দু’ রাক’আত শেষে তৃতীয় রাক’আতে দাঁড়ানোর সময়ে রফ’উল ইয়াদাইন করতে দেখেছেন। (বায়হাক্বী ২/৮০, বুখারীর জুযউল ক্বিরআত, আবূ দাউদ, ইবনে মাজাহ)
(৪) ওয়ায়িল ইবনু হুজর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে সালাত আদায় করেছি। তিনি তাকবীর দিয়ে সালাত আরম্ভ করে দু’হাত উঁচু করলেন। অতঃপর রুকু’ করার সময় এবং রুকু’র পরেও দু’হাত উঁচু করলেন। (আহমাদ, বুখারীর জুযউল ক্বিরাআত, ইবনে মাজাহ, আবূ দাউদ)
(৫) মুহাম্মাদ ইবনু ‘আমর বলেন, আমি নাবী (সা.) এর দশজন সাহাবীর মধ্যে আবূ হুমাইদের নিকট উপস্থিত ছিলাম, তাঁদের (আবূ হুমাইদ, আবূ উসাইদ, সাহল ইবনু সা’দ, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ- (রা.) প্রমুখ সাহাবীগণের মধ্যে একজন আবূ ক্বাতাদাহ ইবনু রবয়ী (রা.) ও ছিলেন। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সালাত সম্পর্কে আপনাদের চাইতে বেশি অবগত। তাঁরা বললেন, তা কিভাবে? আল্লাহর শপথ! আপনি তো আমাদের চেয়ে তাঁর অধিক নিকটবর্তী ও অধিক অনুসরণকারী ছিলেন না। তিনি বললেন, বরং আমি তো তাঁকে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। তাঁরা বললেন, এবার তাহলে উল্লেখ করুন। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সালাতে দাঁড়াতেন তখন দু’হাত উঁচু করতেন এবং যখন রুকু’ করতেন, রুকু’ থেকে মাথা উঠাতেন, এবং দু’ রাক’আত শেষে তৃতীয় রাক’আতে দাঁড়াতেন তখনও দু’ হাত উঁচু করতেন। এ বর্ণনা শুনে তাঁরা সবাই বললেন, আপনি সত্যই বলেছেন। (বুখারীর জুযউল ক্বিরাআত, সহীহ ইবনু মাজাহ, সহীহ আবূ দাউদ)
রফ’উল ইয়াদাইন সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস ও আসারের সংখ্যা এবং সেসবের মান-
(ক) রফ’উল ইয়াদাইন সম্পর্কে বর্ণিত সর্বমোট সহীহ হাদীস ও আসারের সংখ্যা অন্যূন ৪০০ শত। (সিফরুস সাআদাত, পৃ-১৫)
(খ) ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, রফ’উল ইয়াদাইনের হাদীসসমূহের সনদের চেয়ে বিশুদ্ধতম সনদ আর নেই। (ফাতহুল বারী ২/২৫৭)
(গ) হাদীসের অন্যতম ইমাম হাফিয তাকীউদ্দিন সুবকী (রহ.) বলেন, সালাতের মধ্যে রফ’উল ইয়াদাইন করার হাদীস এতো বেশি যে, রফ’উল ইয়াদাইনের হাদীসকে মুতাওয়াতির বলা ছাড়া উপায় নেই। (সুবকীর জুযউ রফ’উল ইয়াদাইন)
রফ’উল ইয়াদাইনের হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীগণের সংখ্যা-
রুকু’তে যাওয়া ও রুকু’ হতে উঠার সময় রফ’উল ইয়াদাইন করা সম্পর্কে চার খলীফাসহ প্রায় ২৫ জন সাহাবী  থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ রয়েছে। (সালাতুর রসূল (সা.), পৃষ্ঠা ৬৫, হাদীস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রকাশিত)
সুতরাং নির্দিধায় বলা যায় যে, রফউল ইয়াদাইন করাটাই উত্তম। এবং এই আমল করাতে সাওয়াব বেশি রয়েছে। বিস্তারিত জানার জন্য যারা নেট ব্যবহার করেন, তারা এই লিঙ্কে ভিজিট করুন:
http://www.peaceinislam.com/sahriar/3836/

প্রশ্নঃ অপবিত্রতা ও বাহ্যিক নাপাক বস্তু থেকে পবিত্রতা অর্জন করার প্রকৃত মাধ্যম কি? সালেহ আহমদ (কুয়েত)
উত্তরঃ যে কোন নাপাকী থেকে পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম হচ্ছে পানি। পানি ছাড়া অন্য কোন মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করা যাবে না। চাই উক্ত পানি পরিচ্ছন্ন হোক বা পবিত্র কোন বস্তু তাতে পড়ার কারণে তাতে কোন পরিবর্তন দেখা যাক। কেননা বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, পবিত্র কোন বস্তুর কারণে যদি পানির মধ্যে পরিবর্তন দেখা যায়, তবে তাকে পানিই বলা হবে। এর পবিত্র করণের ক্ষমতা বিনষ্ট হবে না। এই পানি নিজে পবিত্র অন্যকেও পবিত্র করতে পারে।
পানি যদি না পাওয়া যায় বা পানি ব্যবহার করলে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা যায়, তবে তায়াম্মুমের দিকে অগ্রসর হবে। দু’হাত মাটিতে মেরে তা দ্বারা মুখমণ্ডল মাসেহ করবে এবং উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত মাসেহ করবে।
আর বাহ্যিক ও প্রকাশ্য নাপাক বস্তু থেকে পবিত্রতা অর্জন করার পদ্ধতি হচ্ছে, যে কোন প্রকারে উক্ত নাপাক বস্তু অপসারিত করা। চাই তা পানি দ্বারা হোক বা অন্য কোন বস্তু দ্বারা। কেননা বাহ্যিকভাবে দেখা যায় এমন নাপাক বস্তুর পবিত্রতার উদ্দেশ্য হচ্ছে যে কোন পবিত্র বস্তু দ্বারা তা অপসারিত করা। অতএব পানি বা পেট্রোল বা কোন তরল পদার্থ বা শুস্ক বস্তু দ্বারা যদি পরিপূর্ণরূপে উক্ত নাপাকী অপসারিত করা সম্ভব হয়, তবেই তা পবিত্র হয়ে যাবে। কিন্তু কুকুরের নাপাকী (মুখ দেয়া উচ্ছিষ্ট পাত্র) পবিত্র করার জন্য অবশ্যই সাতবার পানি দ্বারা ধৌত করতে হবে এবং একবার মাটি দ্বারা মাজতে হবে।
এ ভাবেই আমরা জানতে পারব প্রত্যক্ষ নাপাক বস্তু থেকে কিভাবে পবিত্র হতে হয় এবং কিভাবে আভ্যন্তরিন নাপাকী থেকে পবিত্রতা অর্জন করতে হয়।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

Leave a Reply


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.