আমরা কীভাবে রমযানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবো?

আমরা কীভাবে রমযানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবো?

আমরা কীভাবে রমযানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করবো?

সম্মানিত পাঠক ও পাঠিকা! সকলকে পবিত্র রমযানের শুভেচ্ছা জানিয়ে আজকের কলাম আরম্ভ করছি। বছর ঘুরে আবার আমাদের দরজায় পবিত্র রমযান কড়া নাড়ছে। রহমতের সাওগাত নিয়ে আবার হাজির হলো মাহে রমযান। এই মাসের ফযীলত ও গুরুত্ব এত অপরিসীম যে, পূর্বশুরীগণ ছয় মাস পূর্ব হতেই রমযানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন, আবার রমযান চলে গেলে ছয় মাস পর্যন্ত রমযানে কৃত আমল কবূল হওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন।
আশা করছি রমযানের সূচনা লগ্ন হতেই এই মাসের বরকত আমরা অর্জন করতে পারবো, মহান আল্লাহর নিকট এই প্রত্যাশা করছি। আল্লাহ বলছেন: যে ব্যক্তি রমযান মাসে সাক্ষাত পাবে, সে যেন রোযা পালন করে। আসন্ন রমযানকে আমরা কীভাবে অতিক্রম করবো সেই বিষয়ে নিম্নে একটি তালিকা প্রদত্ত হলো। আপনিও চাইলে আমাদের এই তালিকা অনুসরণ করতে পারেন। এবং আরো অন্য কোন বিষয় যোগ করে রমযানের পুরো সময়টা কাজে লাগাতে পারেন। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফীক দান করুন।
প্রথমত মানসিক ও কর্মবিষয়ক তথা আমলগতভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করা: রমযান আসার পূর্বেই, রমযানের বরকত পাওয়ার জন্য দোয়ায় মশগুল থাকা। হে আল্লাহ! আমাকে রমযান পর্যন্ত পৌঁছে দাও, এবং রমযানকে আমার নিকট হাজির করো, এবং রমযানের যাবতীয় কাজ কবুল করো।
রমযান আসার পূর্বেই নিয়ত ঠিক করা: সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে হাদীসে কুদসী বর্ণিত হয়েছে; ‘যখন বান্দা মনে মনে কোন ভালো কাজ করার নিয়ত করে, আমি তার জন্য একটি নেকী লিখে ফেলি। আর আমরা রমযান মাসে নিম্নের কাজগুলোর নিয়ত করতে পারি।
১। গবেষণার সাথে কুরআন অধ্যয়ন ও খতম করা।
২। বিগত জীবনে ঘটে যাওয়া যাবতীয় গোনাহ হতে তাওবা নাসুহ করা।
৩। এই রমযান মাস হতে জীবনের বাকী দিনগুলো ভালো ও কল্যাণমূলক কাজে কটিয়ে দেব এই নিয়ত করা।
৪। যথা সম্ভব বড় বড় নেকের কাজের নিয়ত করা। কেননা এই মাসে সাওয়াব ও প্রতিদান দ্বিগুণ লাভ হয়।
৫। মানুষের সাথে উত্তম আচরণের নিয়ত করা।
৬। এই মাসকে ইসলাম প্রচারের মাস হিসেবে গনীমত মনে করা, এবং দ্বীনী দারসের ব্যবস্থা করা, নিজে দারস পেশ করা, ও দারসে বসা।
৭। ইসলামী প্রোগ্রামের আয়োজন করা, সেখানে মানুষকে দ্বীন সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করা।
৮। রমযান ও রোযা বিষয়ক বই পুস্তক পাঠ করা। এতে করে রমযানের ফযীলত ও মাসায়েল জানা যাবে। এবং রমযানের রোযা ও রাতের আমল সহীহভাবে করা সম্ভব হবে।
৯। রমযানের পূর্বের মাস শাবান মাসে কিছু কিছু রোযা রাখা, অনুশীলন হিসেবে, যাতে করে রমযান মাসে রোযা রাখতে সহজ হয়। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রাসূল (সা.)-কে রমযান ছাড়া শাবান মাসের চেয়ে অন্য কোন মাসে বেশি রোযা রাখতে দেখিনি।
সম্মানিত মুসলিম ভাই বোনেরা! রমযানের ফযীলত হতে লাভবান হোন: রমযান গোনাহ মাফের মাস, জাহান্নাম হতে মুক্তির মাস, এমাসে বরকতপূর্ণ রাত রয়েছে। এ মাসে ফেরেশতাকুল আপনার জন্য মাগফেরাত করতে থাকে, এ মাসে প্রতিদান দ্বিগুণ দেওয়া হয়। আর এসবই তখন সম্ভব যখন আপনি রমযানের প্রস্তুতি প্রথম থেকেই ভালোভাবে করবেন।
১০। রমযানের পুরো মাসের জন্য রোটিন তৈরী করা:

  •  প্রতি দিন রমযান বিষয়ক প্রবন্ধ পাঠ করা, বা শিক্ষামূলক সিডি বা ক্যাসেট হতে শোনা।
  • রমযান ও কুরআন বিষয়ক আয়াতগুলোর ব্যাখ্যাসহ অধ্যয়ন করা।
  •  রমযানের পূর্বে স্বাগতম মাহে রমযানের প্রোগ্রমা বা সেমিনার তৈরী করে মুসলমানদের মাঝে সচেতনতা তৈরী করা।
  • এমাসে নিজের বেতন হতে কিছু পয়সা ওয়াকফ করা, যাতে করে এ মাসে দান করা যায়, বা ইফতার করানো যায়, রমযান বিষয়ক বই কিনে বিতরণ করা যায়, বা কোন গরীব দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের ঘরে রমযানের পূর্বেই এককালীন কিছু খাবারের ব্যবস্থা করা যায়, সেই চেষ্টা করা।
  • সম্ভব হলে এমাসে ওমরা করা, কেননা রমযানে ওমরা করলে হজ্জের সমান সাওয়াব হয়।
  • রমযান বিষয়ক মাসায়েল শিক্ষা করা, রোযা ভঙ্গের কারণ, কোন কোন কাজে রোযার কোন ক্ষতি হয় না। অসুস্থ লোকের রোযা রাখার বিধান ইত্যাদি।
  •  নিজের বাসায় স্ত্রী সন্তান ও পরিবারের সবাইকে রমযানের শুভেচ্ছা জানানো, এবং রমযান মাস নিয়ে মতবিনিময়ের ব্যবস্থা করা, কীভাবে রমযান অতিবাহিত করবে, রোটিন তৈরী করা।

দ্বিতীয়ত দাওয়াতী কাজ বাস্তাবায়নের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা:
একজন দাঈ বা ইসলাম প্রচারক নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে ইসলাম প্রচার করতে পারেন:

  • দাওয়াতী ব্যাগ: এখানে আপনি রমযান বিষয়ক বই, কথিকা, সিডি, মেসওয়াক, হৃদয় আকৃষ্টকারী বই-পুস্তক দিয়ে পূর্ণ করতে পারেন।
  • দান-খয়রাত করা: মানুষকে এই মাসে সাধারণ দানের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা। নিজেও সাধ্যমত দান করা।
  •   দাওয়াতী বই বিতরণ করা: মহল্লাহর মসজিদে বা দোকান বা বিপনীতে রমযান বিষয়ক বই-পুস্তক ও ঈমান বৃদ্ধি করে এমন কথিকা রাখা, যেন সাধারণ মুসাল্লিগণ উপকৃত হতে পারে।
  • কোন ইসলামী সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে দাওয়াতী কাজ করা।
  • সম্মানিত দাঈগণ! নব আবিস্কৃত প্রযুক্তি ব্যবহার করে দাওয়াতী কাজ করার জন্য গবেষণা করা প্রয়োজন। যেন এই রমযান হতে সাধারণ মুসল্লিগণ উপকৃত হতে পারে।

তৃতীয়ত: রমযানে প্রত্যেহ লাভজনক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা:
ফজরের পূর্বে করণীয় কাজসমূহ:
১। তাহাজ্জুদ নামায পড়া: মহান আল্লাহ এরশাদ করছেন: যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সেজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে এবাদত করে, পরকালের আশংকা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, (তারাই তো উত্তম ব্যক্তি) (সূরা যুমার: ৯)
২। সেহরী খাওয়া: রাসূল কারীম (সা.) এরশাদ করেছেন: তোমরা সেহরী গ্রহণ করো, কেননা সেহরীতে বরকত রয়েছে। (বুখারী ও মুসলিম)
৩। ফজরের আযান পর্যন্ত ইস্তেগফার করা: আল্লাহ তায়ালা বলছেন: রাতের শেষ প্রহরে তারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। (যারিয়াত: ১৮)
৪। ফজরের সুন্নাত আদায় করা: রাসূল (সা.) বলেছেন: ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত, দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা রয়েছে, তা অপেক্ষা উত্তম। (মুসলিম)
ফজরের পরে করণীয় কাজসমূহ:
১।  আজানের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে গমন করা:  রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন; যদি তারা জানতো যে, এশার নামায ও ফজরের নামাযের কত গুরুত্ব, তাহলে তারা হামাগুড়ি দিয়ে উপস্থিত হতো। (বুখারী ও মুসলিম)
২। ইকামত পর্যন্ত দোয়া ও যিকিরে মশগুল থাকবে: রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন; আজান ও ইকামতের মধ্যবার্তী সময়ের ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। (আহমদ, তিরমিযী, আবু দাউদ)
৩। নামাযের পরে, সূর্য উদয় পর্যন্ত মসজিদে যিকির করা: কুরআন তেলাওয়াত অধ্যয়ন করা। রাসূলে কারীম (সা.) যখন ফজর নামায পড়তেন, তখন সূর্য উদয় পর্যন্ত আসন করে বসে থাকতেন। (মুসলিম)
৪। অতঃপর দুই রাকায়াত নামায পড়া: রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ফজর নামায জামায়াতে পড়বে অতঃপর সূর্য উদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করবে এবং দুই রাকায়াত নামায পড়বে। তাকে একটি পূর্ণাঙ্গ হজ্জ ও ওমরার সাওয়াব দান করা হবে। (তিরমিযী)
৫। আল্লাহর নিকট দোয়া করা: আল্লাহ যেন এই দিনে বরকতে পরিপূর্ণ করে দেন। রাসূলে কারীম (সা.) বলেন, হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে এই দিনের কল্যাণ কামনা করছি, দিনের প্রশস্ততা, সাহায্য, আলো, বরকত ও হেদায়াত কামনা করছি, তেমনিভাবে এই দিনের অনিষ্টতা হতে আশ্রয় চাচ্ছি। (আবু দাউদ)
৬। হিসাব করে নিদ্রা বা ঘুম যাওয়া: হযরত মুয়াজ (রা.) বলেন, যে, আমি হিসাব করে ঘুমাই এবং হিসাব করে জাগ্রত হই।
৭। কর্মস্থলে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া: রাসূল (সা.) বলেছেন; ব্যক্তির উত্তম উপার্জন তার নিজের হাতের উপার্জন। হযরত দাউদ (আ.) নিজ হাতে কামাই করে খেতেন। (বুখারী)
৮। দিনভর যথাসম্ভব যিকিরে মশগুল থাকা: রাসূলে কারীম (সা.) এরশাদ করেন, জান্নাতীদের কোন আফসোস থাকবে না কিন্তু দুনিয়াতে যেই সময়টি যিকির ছাড়া অতিবাহিত করেছে, সে জন্য আফসোস করবে। (তিবরানী)
৯। দিনে কিছু দান করা: হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যখনই আল্লাহর বান্দারা প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করে, তখনই দু’জন ফেরেশতা অবস্থিত হন। তার মধ্যে একজন বলতে থাকেন, হে আল্লাহ! তুমি দাতা ব্যক্তিকে প্রতিদান দাও। আর অন্যজন বলতে থাকেন, হে আল্লাহ! কৃপণ ব্যক্তিকে লোকসান দাও।” (বুখারী, মুসলিম)
জোহর:
১। জোহরের নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা।
২। দারসের ব্যবস্থা করা। নিজে দারস পেশ করা, বা দারসে বসা।
৩। দারসের পর একটু বিশ্রাম করা। যেন রাতে কিয়ামের নামাযে জাগ্রত থাকা সহজ হয়। রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমার শরীরও হক রয়েছে।
আসর:
১। আসরের নামায জামায়াতে আদায় করা এবং পূর্বে চার রাকায়াত সুন্নাত পড়ার চেষ্টা করা। রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা ঐ বান্দার উপর রহম করুন, যে আসরের পূর্বে চার রাকায়াত নামায পড়ে। (আবু দাউদ তিরমিযী)
২। মসজিদে ওয়াজ নসীহত শ্রবণ করা। রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মসজিদে গেল কোন কিছু শেখার জন্য অথবা অন্যকে শেখানোর জন্য তাকে একটি পূর্ণ হজ্জের সাওয়াব দান করা হবে। (তিবরানী)
৩। মসজিদে কিছুক্ষণ বসা। রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজ গৃহে উত্তমভাবে অজু করে মসজিদে যায়, সে আল্লাহর মেহমান। বাড়িওয়ালা তথা আল্লাহর দায়িত্ব তাকে সম্মান করা। (তিবরানী সনদ জায়্যিদ)
মাগরিব:
১। সূর্যাস্তের পূর্বে দোয়ায় মশগুল থাকা: রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তাদের মধ্য হতে একজন হলেন রোযাদার। যতক্ষণ না ইফতার করে। (তিরমিযী)
২। দোয়া পাঠ করে ইফতার করা: দোয়াটি হলো:    ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ  পিপাসা দূরীভূত হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং আল্লাহ চাহেতো সাওয়াব সাব্যস্ত হলো। (আবু দাউদ)
৩। মাগরিবের নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা।
৪। সন্ধ্যাকালীন যিকিরের জন্য মসজিদে বসা।
৫। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসা যৎসামান্য ওয়াজ নসীহত করা। রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমার স্ত্রীর জন্যও তোমার উপর হক রয়েছে।
৬। এশা ও তারাবীর নামাযের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
এশা:
১। এশার নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা।
২। ইমামের সাথে তারাবীর নামায পুরো আদায় করা। রাসূল (সা.) বলেছেন:  যে ব্যক্তি রমযান মাসে ঈমানসহকারে সাওয়াবের আশায় কিয়াম তথা তারাবীর নামায পড়তে। আল্লাহ তার অতীতের সমস্ত গুনাহ (সগীরা) মায়াফ করে দিবেন। (বুখারী ও মুসলিম)
৩। বিতরের নামায শেষ রাতে পড়া। রাসূলে কারীম (সা.) এরশাদ করেছেন; তোমাদের রাতের শেষ নামায যেন বিতর নামায হয়। (বুখারী ও মুসলিম)
উন্মুক্ত অনুষ্ঠান: আপনি নিকটাত্মীয়-বন্ধু-বান্ধব প্রতিবেশীর সঙ্গে মুলাকাত করবেন। রমযান শীর্ষক আলোচনা করবেন। রমযানের বিশেষ দারসের ব্যবস্থা করবেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সমস্ত আমল করুন। আমীন

Related Post