নিফাক-এর শাব্দিক অর্থ : সেই সুড়ঙ্গ পথ যাতে লুকিয়ে থাকা যায়। এও বলা হয়ে থাকে যে, ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর গর্তের অনেকগুলো মুখের একটি মুখ। তাকে কোন এক মুখ দিয়ে খোঁজা হলে অন্য মুখ দিয়ে সে বের হয়ে যায়।
শরীয়তের পরিভাষায় নিফাকীর অর্থ হল : ভেতরে কুফুরী ও খারাবী লুকিয়ে রেখে বাহিরে ইসলাম জাহির করা। একে নিফাক নামকরণের কারণ হলো সে এক দরজা দিয়ে শরীয়তে প্রবেশ করে অন্য দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়। এ জন্যই আল্লাহ তা’আলা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন : নিশ্চয়ই মুনাফিকরাই ফাসিক, পাপাচারী। (সূরা তাওবা-৬৭)
ফাসিক মানে হলো : শরীয়তের সীমানা থেকে যারা বের হয়ে যায়। আল্লাহ তা’আলা মুনাফিকদেরকে কাফিরদের চেয়েও নিকৃষ্ট বলে গণ্য করেছেন। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন : নিঃসন্দেহে মুনাফিকরা থাকবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। (সূরা নিসা, ১৪৫)
আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন : আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ঈমানদার নয়। তারা আল্লাহ্ এবং ঈমানদারগণকে প্রতারিত করতে চায়। অথচ এতে তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে প্রতারিত করেনা, অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না। তাদের অন্তঃকরণ ব্যধিগ্রস্ত আর আল্লাহ্ তাদের ব্যধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। বস্তূতঃ তাদের জন্য নির্ধারত রয়েছে ভয়াবহ আযাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন। (সূরা বাকারাহ-৮/১০)
নিফাকী দুই প্রকার : প্রথম প্রকার, এ’তেক্বাদ বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নিফাকী : একে বড় নিফাকী বলা হয়। এতে মুনাফিক ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে ইসলামকে জাহির করে এবং কুফুরীকে গোপন রাখে। এ প্রকারের নিফাকী ব্যক্তিকে পুরোপুবিভাবে দ্বীন থেকে বের করে দেয়। উপরন্তু সে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে যায়। আল্লাহ তা’আলা এ প্রকারের মুনাফিকদেরকে যাবতীয় নিকৃষ্ট গুণাবলীতে অভিহিত করেছেন। কখনো কাফির বলেছেন, কখনো বেঈমান বলেছেন, কখনো দ্বীন ও দ্বীনদার লোকদের প্রতি ঠাট্রা বিদ্রুপকারী হিসাবে তাদেরকে বর্ণনা করেছেন এবং এও বলেছেন যে, তারা দ্বীন ও ইসলামের শত্রুদের প্রতি পুরোপুরিভাবে আসক্ত, কেননা তারা ইসলামের শত্রুতায় কাফিরদের সাথে অংশগ্রহণ করে থাকে। এরা সবযুগেই বিদ্যমান, বিশেষ করে যখন ইসলামের শক্তি প্রবলভাবে প্রকাশ পায়। যেহেতু এ অবস্থায় তারা প্রকাশ্যে ইসলামের মোকাবেলা করতে সক্ষম নয়, তাই তারা জাহির করে যে, তারা ইসলামের মধ্যে আছে, যেন ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভিতরে ভিতরে ষড়যন্ত্র পাকাতে পারে এবং মুসলমানদের সাথে মিলেমিশে থেকে নিজেদের জান-মালের হেফাজত করতে পারে।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন : এবং যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ ছিল তারা বলছিল, আমাদেরকে প্রদত্ত আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা বৈ নয়। এবং যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরিববাসী, এটা টিকবার মত জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চল। তাদেরই একদল নবীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল, আমাদের বাড়ী-ঘর খালি, অথচ সেগুলো খালি ছিল না, পলায়ন করাই ছিল তাদের ইচ্ছা। যদি শত্রুপক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হত, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই বিলম্ব করত না। (সূরা আহযাব-১২/১৪)
আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন :- হে নবী, কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করুন এবং মুনাফেকদের সাথে তাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করুন। তাদের ঠিকানা হল জাহান্নাম এবং তাহল নিকৃষ্ট ঠিকানা। (সূরা তাওবা-৭৩) অতএব মুনাফিক বাহ্যিকভাবে আল্লাহ, তাঁর ফেরেস্তাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান আনার ঘোষণা দিলেও অন্তরে এসব কিছু থেকেই সে মুক্ত, বরং এগুলোকে সে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। আল্লাহর প্রতি তার ঈমান নেই, এবং এ বিশ্বাস ও নেই যে, তিনি তাঁর এক বান্দার উপর কালামে পাক নাযিল করেছেন, তাকে মানুষের প্রতি রাসূল করে পাঠিয়েছেন, আল্লাহর হুকুমে তিনি তাদেরকে হেদায়াত করবেন, তাঁর প্রতাপ সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করবেন এবং তাঁর শাস্তির ভয় প্রদর্শন করবেন। কুরআন পাকে আল্লাহ তা’আলা এসব মুনাফিকদের স্বরূপ উম্মোচন করেছেন, তাদের রহস্য উদঘাটন করে দিয়েছেন এবং বান্দাদের সামনে তাদের মোয়ামেলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে তারা এসব মুনাফিকদের ব্যাপারে সতর্ক থাকে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন : আর যখন আপনি তাদেরকে বলবেন, আল্লাহ্ নির্দেশের দিকে এসো, যা তিনি রাসূলের প্রতি নাযিল করেছেন, তখন আপনি মুনাফেকদিগকে দেখবেন, ওরা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণ ভাবে সরে যাচ্ছে। (সূরা নিসা-৬১) মুনাফিকদের কারণে ইসলামের উপর অনেক বেশী বালা মুসীবত নেমে আসে। কেননা ইসলামের প্রকৃত দুশমন হওয়া সত্ত্বেও তারা মুসলিম হিসাবে পরিচিত এবং তাদেরকে ইসলামের সাহায্যকারী ও বন্ধু ভাবা হয়। তারা নানা উপায়ে ইসলামের শত্রুতা করে থাকে। ফলে অজ্ঞ লোকেরা ভাবে যে, এ হল তাদের দ্বীনী এলেম ও সংস্কার কাজের বহিঃপ্রকাশ। অথচ প্রকারান্তরে তা তাদের মূর্খতা এবং ফাসাদ সৃষ্টিরই নামান্তর।
দ্বিতীয় প্রকার : আমলের নিফাকী, এ প্রকারের নিফাকী হল অন্তরে ঈমান রাখার পাশাপাশি মুনাফিকদের কোন কাজে লিপ্ত হওয়া। এ নিফাকীর ফলে ব্যক্তি ইসলামী মিল্লাতের গন্ডী থেকে বের হয়না। তবে বের হবার রাস্তা সুগম হয়ে যায়। এ ধরনের লোকদের মধ্যে ঈমান ও নিফাকী উভয়ের অস্তিত্বই রয়েছে। নিফাকীর পাল্লা ভারী হলে সে পূর্ণ মুনাফিকে পরিণত হয়ে যায়।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন : তারা বলে, আমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং আনুগত্য করি, কিন্তু অতঃপর তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তারা বিশ্বাসী নয়। তাদের মধ্যে ফায়সালা করার জন্য যখন তাদেরকে আল্লাহ্ ও রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। সত্য তাদের স্বপক্ষে হলে তারা বিনীতভাবে রাসূলের কাছে ছুটে আসে। (সূরা নূর-৪৭/৪৯) আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন : সেসব মুনাফেককে সুসংবাদ শুনিয়ে দিন যে, তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। যারা মুসলমানদের বর্জন করে কাফেরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তাদেরই কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে, অথচ যাবতীয় সম্মান শুধুমাত্র আল্লাহ্ই জন্য। (সূরা নিসা- ১৩৮/১৩৯)
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আমাদেরকে পরিপূর্ণ মুসলিম হওয়ার এবং মুনাফিকী আচরণ থেকে বেচেঁ থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন….
Arabic
English
Spanish
Russian
Romanian
Hindi
Tagalog
Bengali
Sinhalese
Nepali

