আল্লাহ তাঁর নূরকে বিকশিত করবেনই

আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে বিকশিত করবেনই

আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে বিকশিত করবেনই

মাসুদা সুলতানা রুমি

দুর্নীতি থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায়

রাসূল (স.) বলেছেন, “পাঁচটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আদম সন্তানকে এক পা’ও নড়তে দেওয়া হবে না।
১. জীবনটা কোন কাজে ব্যয় করেছ?
২. যৌবন কাল কিভাবে কাটিয়েছ?
৩. কোন পথে আয় করেছ?
৪. কোন পথে ব্যয় করেছ?
৫. জ্ঞান অনুযায়ী যথাযথ আমল করা করেছ কিনা? (মিশকাতুল মাসাবীহ আলবানী হাদীস নং ৫১২৫, বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ)
হাদীসটি পড়ে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম। মাত্র পাঁচটি প্রশ্নের মধ্যে জীবনের সকল কর্মকা- আটকে দেওয়া হয়েছে। এই পাঁচটি প্রশ্নের বাইরে আর কোনো প্রশ্ন নেই। অবশ্য ব্যাপারটা এমন নয় যে পরকালের কোনো পরীক্ষা হলে ফেরেস্তারা প্রশ্নগুলো করবে আর আমরা মুখে কিংবা লিখে উত্তর দেবো।
১. এসব প্রশ্নের উত্তর বাস্তব জীবনে আমরা প্র্যাকটিক্যাল করে যাচ্ছি এবং সম্মানিত লেখক (কেরামিন কাতিবিন) তা লিখে যাচ্ছেন?। সেই লিখিত কিতাব খানাই সেদিন এই সব প্রশ্নের উত্তরে পেশ করা হবে। উপর্যুক্ত হাদীসখানা কেউ যদি মনে রাখে বা মেনে চলে তাহলে কি কেউ দুর্নীতিগ্রস্থ হতে পারে? আবোল তাবোল যা ইচ্ছা তাই বললেই তো হবে না। প্রথম প্রশ্নটা গোটা জীবন সম্পর্কে। সারা জীবন কী করা উচিত ছিল আর কী করেছি তার বিবরণ এর মধ্যে।
২. দ্বিতীয় প্রশ্ন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ের। যৌবন কালের। কারণ এই যৌবন কাল এমন একটি সময় যখন ইচ্ছে করলেই ভালো কাজ করা যায় আবার ইচ্ছা করলেই খারাপ কাজ করা যায়।
মহান আল্লাহপাক বলেন, “আমি পছন্দ করি যৌবন কালের ইবাদত।”
অথচ মানুষের ধারণা এই অল্প বয়সে কি আর ইবাদত করবে? আর একটু বয়স হোক দেখা যাবে। তাহলে “ যৌবন কাল কিভাবে অতিবাহিত করেছ?” এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কী তার আমলনামায় লেখা হবে? আর সে কি অকৃতকার্য হবে না?
৩. তৃতীয় এবং চতুর্থ প্রশ্ন কোন পথে বা কীভাবে আয় করেছ আর কীভাবেই বা তা ব্যয় করেছ?
প্রতিটি কাজেরই দুটি দিক বা পথ আছে। একটি আল্লাহ ও তার রাসূলের দেখানো পথ অপরটি ইবলীস বা নাফসের দেখানো পথ। প্রথমটি হালাল উপায় দ্বিতীয়টি হারাম উপায়ে। হযরত ওমর (রা.) বলেছেন, “যদি কেউ জানতে চায় আমি কেমন মৃত্যু পছন্দ করি? তাহলে প্রথমে বলব আমি যেনো যুদ্ধের মাঠে শহীদ হই দ্বিতীয় পছন্দ যেনো হালাল রুজি সন্ধান করতে করতে মারা যাই।” অর্থাৎ হযরত ওমর (রা.)-এর দৃষ্টিতে হালাল রুজি সন্ধান করা জিহাদ করার সমতুল্য। আর হারাম পথে রুজি মানেই তো অন্যকে ঠকানো, সুদ, ঘুষ, জুয়া, জালিয়াতি, আত্মসাত, ভেজাল, মজুদদারী, কালোবাজারি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ আরো যতো ধরনের হারাম রাস্তা আছে সবই অন্য মানুষকে ঠকানো বা হক নষ্ট করা। এইসব কাজকেই বলে দুর্নীতি করা।
যারা এই দুর্নীতিকে নিজেদের আয় রোজগারের মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছে তারাই দুর্নীতিবাজ। এদেরকে দুনিয়ার সবাই ঘৃণা করে আর আখেরাতেও এরা লাঞ্ছিত অপদস্ত ও ঘৃণিত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
দুর্নীতি করা যে খারাপ তা তারা নিজেরাও জানে। এই কাজের জন্য সে যে সমাজে ঘৃণিত হবে তাও সে জানে। তাই সে তার কর্মকা-কে মানুষের কাছে গোপন রাখতে চায়। অন্য মানুষে না জানলেই সব অন্যায় অবৈধ কাজ তার জন্য যেনো বৈধ হয়ে যায়। তার মধ্যে যদি এই অনুভূতি বা বিশ্বাস থাকত যে, “আমার সকল কর্মকা- আল্লাহ দেখছেন। এই কাজের জবাবদিহি করতে হবে। পরিণামে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।” তাহলে নিশ্চয়ই দুর্নীতি করা থেকে সে নিজেকে রক্ষা করতে পারত। পরকালেল প্রতি অবিশ্বাসই মানুষকে বেপরোয়া করে তোলে। অথচ আখেরাতের বিচারে এই ‘আয়ের উৎস’ই মানুষের বেশি সর্বনাশ করবে। পবিত্র কুরআন শরীফে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আালা বলেছেন, “একে অপরের থেকে বেশি পাওয়ার মোহ তোমাদের ভুলের মধ্যে ফেলে রেখেছে। এমন কি (এই চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়েই) তোমরা কবর পর্যন্ত পৌঁছে যাও। (সূরা: তাকাসুর ১-২)
আবার বলেন, “তোমরা যদি নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে (এ চালচলনের কুফল জানতে) তাহলে এভাবে চলতে পারতে না। তোমরা জাহান্নাম দেখবেই। (সূরা: তাকাসুর-৫-৬)
অর্থাৎ আখেরাত সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং দুনিয়ার বেশি সুখ সম্পত্তি লাভের প্রতিযোগিতাই মানুষকে পরকাল সম্পর্কে গাফেল করেছে। পরকালের প্রতি অবিশ্বাস মানুষকে পাপের প্রতি বেপরোয়া করে তোলে।
সংসার ও সন্তানের জন্যই মানুষ আয় রোজগার করে। সংসার ও সন্তানের মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতেই অনেকে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। আল্লাহপাক মানুষকে সাবধনা করে বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের সম্পদ ও সন্তান যেনো তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে না দেয়। (সুরা মুনাফিকুন-৯)
আল্লাহ পাক অন্যত্র বলেছেন, “কোন কোন আপনজনও সে দিন তোমাদের দুশমন।” (সূরা যুখরুফ: ৬৭)
কারণ মাত্রাতিরিক্ত সন্তানের স্নেহ এবং সংসারের মোহ মানুষকে বিবেকহীন করে ফেলে। আমাদের দেশের বড় বড় মন্ত্রী এমপি এবং নেতাদের দিকে তাকালে অবাক হয়ে দেখতে হয় কী পরিমাণ দুর্নীতি তারা করেছে। সমাজের শ্রদ্ধার আসনে বসে জনগণের সম্পদ আত্মসাত করে রাষ্ট্র, সমাজ, জাতি তথা জনগণের চরম সর্বনাশ করতে একটুও তাদের বিবেকে বাধে নি।
কারণ পশুর মতো এদের অন্তরে শুধু ভোগের লিপ্সা এবং সন্তান বাতসল্যই ছিল। অপরের প্রতি, সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি সামান্যতম ভালবাসাও এদের মধ্যে নেই। আর সেই সাথে তাদের এই দুর্নীতিতে সহযোগিতা করেছে স্ত্রী, পুত্র, কন্যারা। শুধু সহযোগিতা বললে ভুল হবে। এই সব পুত্র পরিজনেরা দুর্নীতি করতে উৎসাহ দেয়, অনুপ্রেরণা দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাধ্য করে। এদের বৈধ অবৈধ, সম্ভব অসম্ভব চাহিদা মেটাতে গিয়ে অনেক সৎ ব্যক্তিও শেষ পর্যন্ত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়েছেন। এ ধরনের বহু প্রমাণ আমাদের হাতে আছে।
চার নং প্রশ্ন : কোন পথে ব্যয় করেছ?
যারা আয় অবৈধভাবে করে তারা ব্যয়ও অবৈধ পথেই করে। বৈধ পথের আয় বৈধ পথেয় সাধারণত ব্যয় হয়। আমাদের দেশের উচ্চপদস্থ সরকারী আমলাদের কাছে কোটি কোটি অবৈধ টাকা ধরা পড়ল। টাকা রাখার জায়গা না পেয়ে চাউলের ড্রামে রাখল, বালিশ, তোষকের ভেতরে তুলার বদলে টাকা ভরে রাখল। অথচ তার দুস্থ মা আর প্রতিবন্ধী বোন কি নিদারুণ অর্থ কষ্টে দিন কাটায়। মা সব শুনে অবাক হয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করে, “হামার ছেলের এতো টাকা হামাক মোটে দুই হাজার ট্যাকা দেয় হামার বোবা বেটিকে নিয়ে তাতে হামার চলে না বাপো।”
এদিকে তার স্ত্রী পুত্র কন্যাদের কি অবৈধ দাপট। এমনি আরো অনেক লোক আছে যারা অবৈধ আয় আর অবৈধ ব্যয়ে অভ্যস্থ তারা সবাই ঐ সরকারী আমলার মতো দুনিয়াতেই লজ্জিত লাঞ্ছিত না হলেও আখেরাতে লাঞ্ছিত এবং চরম শাস্তি পাবেই। যদি এখনই তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসে তো ভিন্ন কথা।
এদের সম্পর্কেই আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আমি মানুষকে পয়দা করেছি সর্বোত্তম কাঠামোয়। তারপর তাকে উল্টো ফিরিয়ে নিচদের চেয়েও নিচে নামিয়ে দিয়েছি। তাদেরকে ছাড়া যারা ঈমান আনে ও সৎ কর্ম করতে থাকে। কেননা তাদের জন্য রয়েছে এমন পুরস্কার যা কোনোদিন শেষ হবে না।” (সুরা আত্তীন-৪-৬)
অর্থাৎ মানুষকে এমন উন্নত পর্যায়ের দেহ সৌষ্ঠব দান করা হয়েছে যা অন্য কোনো প্রাণীকে দেওয়া হয় নি। তাকে উন্নত পর্যায়ের চিন্তা উপলব্ধি জ্ঞান ও বুদ্ধি দান করা হয়েছে যা অন্য কোনো সৃষ্টিকে দেওয়া হয় নি। আবার এই মানুষের মধ্যেই যাদের মধ্যে আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান নেই তারা এত নিচদের চেয়েও নিচে নামতে পারে যা কল্পনা করতেও পারা যায় না। তখন তারা নিজেদের লোভ লালসা ও স্বার্থ চরিতার্থের জন্য সকল প্রকার পশুত্বকেও হার মানায়।
এই নিচুতা থেকে রক্ষা পাবে তারাই যারা পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনবে এবং ভালো কাজ মানে আমলে সালেহ করবে। ঈমান আনা মানে’ আল্লাহ ও তার রাসূল এবং তার কিতাবের উপর বিশ্বাস করা। এই বিশ্বাসই পারে আমাদের নিচুতার হাত থেকে রক্ষা করতে।
উপরোল্লিখিত হাদীসের পঞ্চম প্রশ্ন, জ্ঞান অনুযায়ী যথাযথ আমল করা হয়েছে কিনা?
আমরা মুসলিম ঘরে জন্ম নিয়েছি, অনেকে পারিবারিক সূত্রে ইসলাম সম্পর্কে অনেক কিছু জানার সুযোগ পাই, আবার অনেকে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে গিয়ে ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পাই, অনেকে বই-পুস্তক পাঠ করে জানতে পারি, এক কথায় জ্ঞানানুযায়ী আমল করা হলো কিনা জবাবদিহি করতে হবে। এই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অনুভূতিই পারে সকল প্রকার নিচুতা ও দুর্নীতি করা থেকে সকল মানুষকে হেফাজত করতে। দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি ও সম্মান দিতে। আমাদের পরিবারের প্রত্যেকের মধ্যে যদি এই অনুভূতি সৃষ্টি হয়। সমাজ এবং দেশের জনগণের মধ্যে যদি এই অনুভূতির সৃষ্টি হয়। তাহলেই পেতে পারি একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ তথা দেশ।
কুরআন এবং হাদীস অধ্যয়ন এবং সেই অনুযায়ী জীবন যাপনই দুর্নীতি থেকে নিজেকে রক্ষা করার একমাত্র উপায়। (চলবে…)

Related Post